৫১০০ মিটার উঁচুতে সোনার আশায় মানুষের বসতি.
মেঘের ওপরে এক শহর। চারদিকে বরফঢাকা পাহাড়। তীব্র ঠান্ডা। বাতাসও পাতলা। সেখানে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াটাই যেন এক লড়াই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ১০০ মিটার ওপরে গড়ে উঠেছে শহরটি। নাম লা রিনকোনাডা। দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত এই শহর পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থায়ী মানববসতি হিসেবে পরিচিত।এখানে বেঁচে থাকা সহজ নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় এই উচ্চতায় বাতাসের চাপ অনেক কম। ফলে প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসে পৌঁছানো অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক। নতুন কেউ এ উচ্চতায় গেলে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। দীর্ঘদিন বসবাস করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটে না। অনেক বাসিন্দার মধ্যে দেখা দেয় ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস বা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চতাজনিত অসুস্থতা।তারপরও মানুষ এখানে থাকে। কেউ কয়েক বছর। কেউ আবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বিভিন্ন সময়ে শহরটির জনসংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার বা তার বেশি বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে এ সংখ্যা স্থির নয়। কারণ শহরের অর্থনীতি মূলত সোনার খনিকে ঘিরে। সোনার দাম বাড়লে মানুষ আসে। কাজ কমে গেলে অনেকে চলে যায়।লা রিনকোনাডার গল্প মূলত সোনাকে ঘিরেই। এই সোনা যেমন মানুষকে টানে, তেমনি ডেকে আনে নানা বিপদ।শহরটি মাউন্ট আনানেয়ার ঢালে। কাছেই রয়েছে বিশাল হিমবাহ। এত উচ্চতায় কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব। ফলে নিচু এলাকা থেকে খাবার আনতে হয়। শহরের অনেক ঘরে স্বাভাবিক পানির ব্যবস্থাও নেই। নেই পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। টিনের তৈরি ঘর, কাদামাটি, বরফ ও খনির বর্জ্য—এসবই এখানকার নিত্যদিনের দৃশ্য।দিন শুরু হয় খনিতে। পাহাড়ের ভেতরের অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢোকেন শ্রমিকেরা। সোনা পাওয়ার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন তাঁরা। তবে সেই পথ সব সময় ঘরে ফেরার পথ হয় না। খনিতে দুর্ঘটনা ঘটে। সুড়ঙ্গ ধসে পড়তে পারে। রয়েছে অক্সিজেনের ঘাটতিও। সোনার সন্ধানে খনিতে ঢুকে অনেক শ্রমিক আর ফিরে আসেন না।খনির বিপদের পাশাপাশি রয়েছে অপরাধও। সোনা বিক্রির পর শ্রমিকদের ছিনতাই ও হত্যার ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনাও বিরল নয়। মানব পাচারের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন শহর ও দেশ থেকে নারী ও কিশোরীদের এনে বার ও পতিতালয়ে কাজে বাধ্য করার ঘটনাও সামনে এসেছে। এ কারণে লা রিনকোনাডাকে কখনো কখনো ‘পেরুর আইনহীন শহর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।সোনার চকচকে রঙের আড়ালে রয়েছে আরেক বিপদ। সোনা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত পারদ বা মারকারি পরিবেশ দূষিত করছে। খনি থেকে বের হওয়া বর্জ্য আশপাশে জমছে। এর প্রভাব পড়ছে পানি ও বরফেও। যে পাহাড় মানুষের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখায়, সেই পাহাড়ই আবার তাদের জীবন ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।শীতও এখানকার বড় প্রতিপক্ষ। তাপমাত্রা প্রায়ই শূন্য ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। অথচ অনেক ঘরে পর্যাপ্ত উষ্ণতার ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ থাকলেও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে শহরটি অনেক পিছিয়ে। হাসপাতাল, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য সংগ্রহের মতো সেবাও সীমিত।তারপরও মানুষ ফিরে আসে।কারও চোখে সোনার স্বপ্ন। কারও কাছে এটি জীবিকার শেষ ভরসা। কেউ আসে ভাগ্য বদলাতে। আবার কেউ আসে আগের প্রজন্মের পথ ধরে।প্রতিদিন তাঁরা পাতলা বাতাসে শ্বাস নেন। বরফশীতল পাহাড়ে কাজ করেন। ঝুঁকিপূর্ণ খনিতে নামেন। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করেন প্রকৃতি, দারিদ্র্য ও নানা সামাজিক সংকটের সঙ্গে।লা রিনকোনাডা তাই শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মানববসতি নয়। এটি মানুষের সীমা পরীক্ষা করার এক নির্মম জায়গা। এখানে প্রতিটি শ্বাস মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল জায়গাতেও মানুষ বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেয়।আর সেই পথের কেন্দ্রে রয়েছে সোনার স্বপ্ন। ৫ হাজার ১০০ মিটার ওপরে গড়ে ওঠা লা রিনকোনাডা প্রতিদিন সেই স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ঝুঁকির গল্প বলে।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
মেঘের ওপরে এক শহর। চারদিকে বরফঢাকা পাহাড়। তীব্র ঠান্ডা। বাতাসও পাতলা। সেখানে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াটাই যেন এক লড়াই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ১০০ মিটার ওপরে গড়ে উঠেছে শহরটি। নাম লা রিনকোনাডা। দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত এই শহর পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থায়ী মানববসতি হিসেবে পরিচিত।
এখানে বেঁচে থাকা সহজ নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় এই উচ্চতায় বাতাসের চাপ অনেক কম। ফলে প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসে পৌঁছানো অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক। নতুন কেউ এ উচ্চতায় গেলে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। দীর্ঘদিন বসবাস করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটে না। অনেক বাসিন্দার মধ্যে দেখা দেয় ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস বা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চতাজনিত অসুস্থতা।
তারপরও মানুষ এখানে থাকে। কেউ কয়েক বছর। কেউ আবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বিভিন্ন সময়ে শহরটির জনসংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার বা তার বেশি বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে এ সংখ্যা স্থির নয়। কারণ শহরের অর্থনীতি মূলত সোনার খনিকে ঘিরে। সোনার দাম বাড়লে মানুষ আসে। কাজ কমে গেলে অনেকে চলে যায়।
লা রিনকোনাডার গল্প মূলত সোনাকে ঘিরেই। এই সোনা যেমন মানুষকে টানে, তেমনি ডেকে আনে নানা বিপদ।
শহরটি মাউন্ট আনানেয়ার ঢালে। কাছেই রয়েছে বিশাল হিমবাহ। এত উচ্চতায় কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব। ফলে নিচু এলাকা থেকে খাবার আনতে হয়। শহরের অনেক ঘরে স্বাভাবিক পানির ব্যবস্থাও নেই। নেই পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। টিনের তৈরি ঘর, কাদামাটি, বরফ ও খনির বর্জ্য—এসবই এখানকার নিত্যদিনের দৃশ্য।
দিন শুরু হয় খনিতে। পাহাড়ের ভেতরের অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢোকেন শ্রমিকেরা। সোনা পাওয়ার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন তাঁরা। তবে সেই পথ সব সময় ঘরে ফেরার পথ হয় না। খনিতে দুর্ঘটনা ঘটে। সুড়ঙ্গ ধসে পড়তে পারে। রয়েছে অক্সিজেনের ঘাটতিও। সোনার সন্ধানে খনিতে ঢুকে অনেক শ্রমিক আর ফিরে আসেন না।
খনির বিপদের পাশাপাশি রয়েছে অপরাধও। সোনা বিক্রির পর শ্রমিকদের ছিনতাই ও হত্যার ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনাও বিরল নয়। মানব পাচারের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন শহর ও দেশ থেকে নারী ও কিশোরীদের এনে বার ও পতিতালয়ে কাজে বাধ্য করার ঘটনাও সামনে এসেছে। এ কারণে লা রিনকোনাডাকে কখনো কখনো ‘পেরুর আইনহীন শহর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
সোনার চকচকে রঙের আড়ালে রয়েছে আরেক বিপদ। সোনা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত পারদ বা মারকারি পরিবেশ দূষিত করছে। খনি থেকে বের হওয়া বর্জ্য আশপাশে জমছে। এর প্রভাব পড়ছে পানি ও বরফেও। যে পাহাড় মানুষের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখায়, সেই পাহাড়ই আবার তাদের জীবন ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।
শীতও এখানকার বড় প্রতিপক্ষ। তাপমাত্রা প্রায়ই শূন্য ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। অথচ অনেক ঘরে পর্যাপ্ত উষ্ণতার ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ থাকলেও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে শহরটি অনেক পিছিয়ে। হাসপাতাল, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য সংগ্রহের মতো সেবাও সীমিত।
তারপরও মানুষ ফিরে আসে।
কারও চোখে সোনার স্বপ্ন। কারও কাছে এটি জীবিকার শেষ ভরসা। কেউ আসে ভাগ্য বদলাতে। আবার কেউ আসে আগের প্রজন্মের পথ ধরে।
প্রতিদিন তাঁরা পাতলা বাতাসে শ্বাস নেন। বরফশীতল পাহাড়ে কাজ করেন। ঝুঁকিপূর্ণ খনিতে নামেন। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করেন প্রকৃতি, দারিদ্র্য ও নানা সামাজিক সংকটের সঙ্গে।
লা রিনকোনাডা তাই শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মানববসতি নয়। এটি মানুষের সীমা পরীক্ষা করার এক নির্মম জায়গা। এখানে প্রতিটি শ্বাস মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল জায়গাতেও মানুষ বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেয়।
আর সেই পথের কেন্দ্রে রয়েছে সোনার স্বপ্ন। ৫ হাজার ১০০ মিটার ওপরে গড়ে ওঠা লা রিনকোনাডা প্রতিদিন সেই স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ঝুঁকির গল্প বলে।