গঙ্গা চুক্তির ৩০ বছর: বাংলাদেশ কী পেল, কী হারাল? সামনে কী হতে পারে
ফারাক্কা থেকে পদ্মা—তিন দশকের পানির হিসাব, সামনে নতুন সমঝোতার অপেক্ষা
জি এম আবু সাঈদ
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৬ AM
সংবাদটি শুনুনAI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
গঙ্গা চুক্তির ৩০ বছর: বাংলাদেশ কী পেল, কী হারাল? সামনে কী হতে পারে.
ফারাক্কা থেকে পদ্মা—তিন দশকের পানির হিসাব, সামনে নতুন সমঝোতার অপেক্ষা. গঙ্গা শুধু একটি নদীর নাম নয়। বাংলাদেশের জন্য এটি কৃষি, জীববৈচিত্র্য, নৌপথ, মৎস্য, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রবাহমান জীবনরেখা। আর সেই গঙ্গার পানি ভাগাভাগি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়—১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি।তিন দশক আগে করা এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। ফলে নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—তিন দশকের এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে এবং এবার কেমন চুক্তি চায় ঢাকা?ফারাক্কা থেকে ১৯৯৬-এর চুক্তিগঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মতভেদ নতুন নয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকেই এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে।পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেয়াদি চুক্তি ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে পানি বণ্টনের চেষ্টা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছরের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে পৌঁছায়। চুক্তিতে জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ কীভাবে দুই দেশ ভাগ করে নেবে, তার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান ভাগে পানি পাবে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশকে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ন্যূনতম ৪০ হাজার কিউসেক পাবে এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পাবে। মার্চের ১১ তারিখ থেকে মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত বিশেষ কিছু সময়ের জন্য উভয় দেশের ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।কী পেল বাংলাদেশ?সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল—দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর গঙ্গার পানি বণ্টনে একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় কাঠামো তৈরি হওয়া।চুক্তির ফলে পানি পরিমাপ, তথ্য বিনিময় এবং দুই দেশের যৌথ পর্যবেক্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফারাক্কা ও বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য যৌথ কমিটির ব্যবস্থাও রয়েছে।চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে আলোচনার একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করেছে—এটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর আগে বিভিন্ন মেয়াদি সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হলেও ১৯৯৬ সালের চুক্তি বাংলাদেশকে ৩০ বছরের একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো দেয়।২০২৬ সালের শুরুতেও দুই দেশের যৌথ দল গঙ্গা ও পদ্মায় পানি পরিমাপ শুরু করেছে। চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি প্রবাহের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কী হারাল বাংলাদেশ?সমস্যার জায়গাটিও এখানেই।চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমের পানির সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে পদ্মা অববাহিকায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।একাধিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ কম পানি পেয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণায় দেখা যায়, হার্ডিঞ্জ ব্রিজে চুক্তিতে প্রত্যাশিত প্রবাহের তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে কম পানি পেয়েছে। অন্য একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একই সময়ে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় বাংলাদেশ ৫২ শতাংশ সময়ে কম পানি পেয়েছে।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চুক্তির পানি হিসাব করা হয় ফারাক্কায় প্রবাহের ভিত্তিতে। ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত স্থানে পানি পৌঁছানোর পথে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, বাষ্পীভবন, ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু ফারাক্কায় কত পানি ছাড়া হলো, সেটি দিয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তির পুরো চিত্র বোঝা যায় না।শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে লবণাক্ততাগঙ্গার পানি কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু নদীর পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও পরিবেশেও এর প্রভাব পড়েছে।শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে কৃষিজমি, মিঠা পানির জলাভূমি ও মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তারের সঙ্গে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।অন্যদিকে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আবার ভিন্ন। তখন উজান থেকে বিপুল পানি নেমে এলে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু ‘কত পানি পেলাম’—এমন সরল হিসাবের নয়; বরং কখন কত পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।১৯৯৬-এর পৃথিবী আর ২০২৬-এর পৃথিবী এক নয়গঙ্গা চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেই।১৯৯৬ সালে যে জলপ্রবাহ, জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্পায়ন ও জলবায়ু বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে চুক্তি করা হয়েছিল, তিন দশক পর সেই বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে নদীর প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে উজানে সেচ, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যবহারও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। ফলে পুরোনো তথ্য ও পুরোনো হিসাব দিয়ে ভবিষ্যতের পানিবণ্টন নির্ধারণ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।এবার বাংলাদেশের চাওয়া কী হতে পারে?চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তির জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। শুধু আগের চুক্তি নবায়ন নয়, পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য ও পূর্বানুমানযোগ্য পানিপ্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া, যৌথভাবে নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তথ্য বিনিময় এবং চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকর নজরদারি।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গঙ্গার পানি বণ্টনকে শুধু ফারাক্কা-কেন্দ্রিক না রেখে পুরো অববাহিকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অংশ করা। কারণ নদী শুধু একটি নির্দিষ্ট সীমান্ত বা ব্যারাজের মধ্যে আটকে থাকে না; এর প্রবাহের সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ, নদীর চরিত্র, পলি, মৎস্য ও মানুষের জীবন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।সামনে কী হতে পারে?চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি পথ—পুরোনো কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে মেয়াদ বাড়ানো, সংশোধিত শর্তে নতুন চুক্তি করা অথবা আরও বিস্তৃত অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে যাওয়া।তবে চুক্তি না থাকলে অনিশ্চয়তা বাড়বে। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তি না থাকলে উজানের দেশ হিসেবে ভারতের পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে। তাই নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো বাংলাদেশের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।এক্ষেত্রে শুধু কূটনৈতিক আলোচনা নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী তথ্য-উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞ, পানি প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের সমন্বিত প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ।পানি নিয়ে ভবিষ্যতের লড়াইগঙ্গা চুক্তির ৩০ বছর পূর্তি আসলে শুধু একটি পুরোনো চুক্তির হিসাব মেলানোর সময় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়।কারণ বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে গঙ্গা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ দীর্ঘমেয়াদি পানি বণ্টন চুক্তি রয়েছে। অথচ দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর অভিন্ন নদীগুলোর প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত।তাই এবার প্রশ্নটি শুধু ‘বাংলাদেশ কত কিউসেক পানি পাবে’—এখানে আটকে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হতে হবে—আগামী ৩০ বা ৫০ বছরে নদীটি কীভাবে বাঁচবে, দুই দেশের মানুষ কীভাবে পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কীভাবে মোকাবিলা করা হবে।তিন দশক আগে গঙ্গার পানি নিয়ে একটি সমঝোতার মাধ্যমে যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তার নতুন অধ্যায় লেখার সময় এসেছে। সেই অধ্যায়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হতে পারে—ন্যায্যতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
গঙ্গা শুধু একটি নদীর নাম নয়। বাংলাদেশের জন্য এটি কৃষি, জীববৈচিত্র্য, নৌপথ, মৎস্য, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রবাহমান জীবনরেখা। আর সেই গঙ্গার পানি ভাগাভাগি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়—১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি।
তিন দশক আগে করা এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। ফলে নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—তিন দশকের এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে এবং এবার কেমন চুক্তি চায় ঢাকা?
ফারাক্কা থেকে ১৯৯৬-এর চুক্তি
গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মতভেদ নতুন নয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকেই এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেয়াদি চুক্তি ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে পানি বণ্টনের চেষ্টা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছরের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে পৌঁছায়। চুক্তিতে জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ কীভাবে দুই দেশ ভাগ করে নেবে, তার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান ভাগে পানি পাবে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশকে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ন্যূনতম ৪০ হাজার কিউসেক পাবে এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পাবে। মার্চের ১১ তারিখ থেকে মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত বিশেষ কিছু সময়ের জন্য উভয় দেশের ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কী পেল বাংলাদেশ?
সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল—দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর গঙ্গার পানি বণ্টনে একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় কাঠামো তৈরি হওয়া।
চুক্তির ফলে পানি পরিমাপ, তথ্য বিনিময় এবং দুই দেশের যৌথ পর্যবেক্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফারাক্কা ও বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য যৌথ কমিটির ব্যবস্থাও রয়েছে।
চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে আলোচনার একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করেছে—এটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর আগে বিভিন্ন মেয়াদি সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হলেও ১৯৯৬ সালের চুক্তি বাংলাদেশকে ৩০ বছরের একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো দেয়।
২০২৬ সালের শুরুতেও দুই দেশের যৌথ দল গঙ্গা ও পদ্মায় পানি পরিমাপ শুরু করেছে। চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি প্রবাহের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কী হারাল বাংলাদেশ?
সমস্যার জায়গাটিও এখানেই।
চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমের পানির সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে পদ্মা অববাহিকায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
একাধিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ কম পানি পেয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণায় দেখা যায়, হার্ডিঞ্জ ব্রিজে চুক্তিতে প্রত্যাশিত প্রবাহের তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে কম পানি পেয়েছে। অন্য একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একই সময়ে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় বাংলাদেশ ৫২ শতাংশ সময়ে কম পানি পেয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চুক্তির পানি হিসাব করা হয় ফারাক্কায় প্রবাহের ভিত্তিতে। ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত স্থানে পানি পৌঁছানোর পথে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, বাষ্পীভবন, ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু ফারাক্কায় কত পানি ছাড়া হলো, সেটি দিয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তির পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে লবণাক্ততা
গঙ্গার পানি কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু নদীর পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও পরিবেশেও এর প্রভাব পড়েছে।
শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে কৃষিজমি, মিঠা পানির জলাভূমি ও মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তারের সঙ্গে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আবার ভিন্ন। তখন উজান থেকে বিপুল পানি নেমে এলে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু ‘কত পানি পেলাম’—এমন সরল হিসাবের নয়; বরং কখন কত পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৬-এর পৃথিবী আর ২০২৬-এর পৃথিবী এক নয়
গঙ্গা চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেই।
১৯৯৬ সালে যে জলপ্রবাহ, জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্পায়ন ও জলবায়ু বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে চুক্তি করা হয়েছিল, তিন দশক পর সেই বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে নদীর প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে উজানে সেচ, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যবহারও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। ফলে পুরোনো তথ্য ও পুরোনো হিসাব দিয়ে ভবিষ্যতের পানিবণ্টন নির্ধারণ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এবার বাংলাদেশের চাওয়া কী হতে পারে?
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তির জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। শুধু আগের চুক্তি নবায়ন নয়, পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য ও পূর্বানুমানযোগ্য পানিপ্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া, যৌথভাবে নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তথ্য বিনিময় এবং চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকর নজরদারি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গঙ্গার পানি বণ্টনকে শুধু ফারাক্কা-কেন্দ্রিক না রেখে পুরো অববাহিকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অংশ করা। কারণ নদী শুধু একটি নির্দিষ্ট সীমান্ত বা ব্যারাজের মধ্যে আটকে থাকে না; এর প্রবাহের সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ, নদীর চরিত্র, পলি, মৎস্য ও মানুষের জীবন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
সামনে কী হতে পারে?
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি পথ—পুরোনো কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে মেয়াদ বাড়ানো, সংশোধিত শর্তে নতুন চুক্তি করা অথবা আরও বিস্তৃত অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে যাওয়া।
তবে চুক্তি না থাকলে অনিশ্চয়তা বাড়বে। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তি না থাকলে উজানের দেশ হিসেবে ভারতের পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে। তাই নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো বাংলাদেশের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে শুধু কূটনৈতিক আলোচনা নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী তথ্য-উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞ, পানি প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের সমন্বিত প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ।
পানি নিয়ে ভবিষ্যতের লড়াই
গঙ্গা চুক্তির ৩০ বছর পূর্তি আসলে শুধু একটি পুরোনো চুক্তির হিসাব মেলানোর সময় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়।
কারণ বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে গঙ্গা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ দীর্ঘমেয়াদি পানি বণ্টন চুক্তি রয়েছে। অথচ দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর অভিন্ন নদীগুলোর প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত।
তাই এবার প্রশ্নটি শুধু ‘বাংলাদেশ কত কিউসেক পানি পাবে’—এখানে আটকে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হতে হবে—আগামী ৩০ বা ৫০ বছরে নদীটি কীভাবে বাঁচবে, দুই দেশের মানুষ কীভাবে পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কীভাবে মোকাবিলা করা হবে।
তিন দশক আগে গঙ্গার পানি নিয়ে একটি সমঝোতার মাধ্যমে যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তার নতুন অধ্যায় লেখার সময় এসেছে। সেই অধ্যায়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হতে পারে—ন্যায্যতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা।