ডিজিটাল অর্থনীতিতেও কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের তরুণীরা?
প্রোব ডেস্ক
রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৯ PM
সংবাদটি শুনুনAI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
ডিজিটাল অর্থনীতিতেও কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের তরুণীরা?.
বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কোডিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের মতো খাত তরুণদের জন্য আয়ের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই সুযোগ থেকে এখনও পিছিয়ে আছেন একটি বড় অংশ তরুণী। গত এক দশকে নারীর কর্মে যুক্ত হওয়ার হার বাড়লেও, ডিজিটাল অর্থনীতিতে সমতা এখনও অধরা। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে বেশ কিছু সামাজিক ও কাঠামোগত কারণকে দায়ী করছেন।যেসব বাধায় পিছিয়ে তরুণীরাডিজিটাল কাজে যুক্ত হতে প্রথমেই দরকার ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট। কিন্তু অনেক পরিবারে মেয়েদের জন্য এসব যন্ত্র কেনাকে এখনও ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভাবা হয়। সাইবার ক্যাফে বা ট্রেনিং সেন্টারে ছেলেদের মতো সময় কাটানোর স্বাধীনতাও অনেক তরুণীর নেই।অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে অনেক তরুণী সাইবার বুলিং, হ্যাকিং ও হ্যারাজমেন্টের শিকার হন। নিরাপত্তার অভাব ও পারিবারিক সম্মানহানির ভয়ে অনেকে মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেন।সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এআই বা সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চ আয়ের কাজের জন্য দরকার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষা। কিন্তু সামাজিক ভুল ধারণার কারণে মেয়েদের এসব বিষয়ে পড়তে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে তারা কম আয়ের সাধারণ অনলাইন কাজেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকেন।পড়াশোনা ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপে অনেক তরুণী ফ্রিল্যান্সিংয়ের বড় প্রজেক্ট বা কঠোর ডেডলাইনের কাজ নিতে পারেন না। এই ‘টাইম পোভার্টি’ তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। এ ছাড়া নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা পরিচয়পত্র ব্যবহারের স্বাধীনতা না থাকায় আয়ের টাকা তুলতেও তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।সংখ্যায় অগ্রগতি, বাস্তবে বৈষম্যজাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ এখন নারী, যা এক দশক আগের চেয়ে অনেক বেশি। তবে কর্মক্ষেত্রে ঢোকার পরও মজুরি, পদোন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের চেয়ে পেছনে, কেবল আফগানিস্তানের ওপরে। এর মূল কারণ হিসেবে দুর্বল আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়নের ঘাটতিকে দায়ী করা হয়েছে। যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা ও শিশুযত্ন কেন্দ্রের অভাবে অনেক তরুণী কর্মজীবন মাঝপথেই ছেড়ে দিচ্ছেন, বিশেষত শহরাঞ্চলে।ফ্রিল্যান্সিংয়েও পিছিয়ে নারীরাবিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সারদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে হলেও, বাংলাদেশে এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ডিজিটাল মাধ্যম কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করলেও একইসঙ্গে নতুন এক বৈষম্যও তৈরি করছে। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ভীতি থেকে অনেক তরুণী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হতে দ্বিধা বোধ করেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।করণীয় কীবিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করলেই সমতা আসে না, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। তরুণীদের জন্য বিনামূল্যে বা কম খরচে আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত স্কলারশিপ চালু করা জরুরি। জামানতবিহীন সহজ শর্তে ডিভাইস লোন ও ইন্টারনেট ভর্তুকি দিলে প্রযুক্তিগত সম্পদের ঘাটতি কমবে।অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কঠোর আইন প্রয়োগ করে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সমমজুরি আইনের প্রয়োগ, শিশুযত্ন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা তরুণীদের টিকে থাকতে সহায়ক হবে। নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তরুণ নারীদের অন্তর্ভুক্তিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই গড়ে উঠবে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি। তাই তরুণীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার। প্রযুক্তিকে লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কোডিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের মতো খাত তরুণদের জন্য আয়ের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই সুযোগ থেকে এখনও পিছিয়ে আছেন একটি বড় অংশ তরুণী। গত এক দশকে নারীর কর্মে যুক্ত হওয়ার হার বাড়লেও, ডিজিটাল অর্থনীতিতে সমতা এখনও অধরা। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে বেশ কিছু সামাজিক ও কাঠামোগত কারণকে দায়ী করছেন।
যেসব বাধায় পিছিয়ে তরুণীরা
ডিজিটাল কাজে যুক্ত হতে প্রথমেই দরকার ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট। কিন্তু অনেক পরিবারে মেয়েদের জন্য এসব যন্ত্র কেনাকে এখনও ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভাবা হয়। সাইবার ক্যাফে বা ট্রেনিং সেন্টারে ছেলেদের মতো সময় কাটানোর স্বাধীনতাও অনেক তরুণীর নেই।
অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে অনেক তরুণী সাইবার বুলিং, হ্যাকিং ও হ্যারাজমেন্টের শিকার হন। নিরাপত্তার অভাব ও পারিবারিক সম্মানহানির ভয়ে অনেকে মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেন।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এআই বা সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চ আয়ের কাজের জন্য দরকার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষা। কিন্তু সামাজিক ভুল ধারণার কারণে মেয়েদের এসব বিষয়ে পড়তে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে তারা কম আয়ের সাধারণ অনলাইন কাজেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকেন।
পড়াশোনা ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপে অনেক তরুণী ফ্রিল্যান্সিংয়ের বড় প্রজেক্ট বা কঠোর ডেডলাইনের কাজ নিতে পারেন না। এই ‘টাইম পোভার্টি’ তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। এ ছাড়া নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা পরিচয়পত্র ব্যবহারের স্বাধীনতা না থাকায় আয়ের টাকা তুলতেও তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সংখ্যায় অগ্রগতি, বাস্তবে বৈষম্য
জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ এখন নারী, যা এক দশক আগের চেয়ে অনেক বেশি। তবে কর্মক্ষেত্রে ঢোকার পরও মজুরি, পদোন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের চেয়ে পেছনে, কেবল আফগানিস্তানের ওপরে। এর মূল কারণ হিসেবে দুর্বল আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়নের ঘাটতিকে দায়ী করা হয়েছে। যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা ও শিশুযত্ন কেন্দ্রের অভাবে অনেক তরুণী কর্মজীবন মাঝপথেই ছেড়ে দিচ্ছেন, বিশেষত শহরাঞ্চলে।
ফ্রিল্যান্সিংয়েও পিছিয়ে নারীরা
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সারদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে হলেও, বাংলাদেশে এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ডিজিটাল মাধ্যম কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করলেও একইসঙ্গে নতুন এক বৈষম্যও তৈরি করছে। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ভীতি থেকে অনেক তরুণী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হতে দ্বিধা বোধ করেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করলেই সমতা আসে না, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। তরুণীদের জন্য বিনামূল্যে বা কম খরচে আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত স্কলারশিপ চালু করা জরুরি। জামানতবিহীন সহজ শর্তে ডিভাইস লোন ও ইন্টারনেট ভর্তুকি দিলে প্রযুক্তিগত সম্পদের ঘাটতি কমবে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কঠোর আইন প্রয়োগ করে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সমমজুরি আইনের প্রয়োগ, শিশুযত্ন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা তরুণীদের টিকে থাকতে সহায়ক হবে। নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তরুণ নারীদের অন্তর্ভুক্তিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই গড়ে উঠবে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি। তাই তরুণীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার। প্রযুক্তিকে লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।