গণভবন থেকে জুলাই জাদুঘর, দেয়ালে দেয়ালে রক্তাক্ত ইতিহাস
ঢাকা প্রোব ডেস্ক
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৩ PM
সংবাদটি শুনুনAI Voice
প্লে করতে বাটনে চাপুন
গণভবন থেকে জুলাই জাদুঘর, দেয়ালে দেয়ালে রক্তাক্ত ইতিহাস.
একসময় দেশের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল গণভবন। এখন সেই ভবনই হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের স্মৃতিবাহী স্থান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনসহ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় তুলে ধরে গণভবনকে রূপ দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই জাদুঘর’-এ। ভবনের দেয়াল, কক্ষ ও প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত নানা নিদর্শনে উঠে এসেছে আন্দোলন-সংগ্রাম, সহিংসতা ও মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতি।জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি ও স্লোগান। ‘বিকল্প কে, তুমি আমি আমরা’, ‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা’ এবং ‘লং মার্চ টু ঢাকা’—আন্দোলনের দিনগুলোর বহুল উচ্চারিত স্লোগানগুলো সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।আরও ভেতরে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের ছবি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্র। মুক্তিযুদ্ধ, ছয় দফা, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, বাকশাল, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।জাদুঘরের মাঠের একটি অংশজুড়ে রয়েছে প্রতীকী গণকবর। সেখানে লেখা—‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান’। পাশে রয়েছে নিহত ও শহীদদের নামসংবলিত ফলক। এসব প্রতীকী উপস্থাপনা দর্শনার্থীদের সামনে দেশের বিভিন্ন সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতি তুলে ধরে।এর পাশেই রয়েছে কাঁধে কফিন বহনকারী কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার ভাস্কর্য। এর মাধ্যমে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে। পাশের আরেকটি নামফলকে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের নাম। সেখানে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাবলির স্মৃতিও স্থান পেয়েছে।২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে রিকশাচালক সুজনের ভাস্কর্য। রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের অভিবাদন জানাচ্ছেন। রয়েছে জুলাইয়ে নিহত ভাইকে কাঁধে নিয়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়া দুই বোনের স্মৃতিচিত্রও।জাদুঘরের অন্যতম আলোচিত অংশ ‘আয়নাঘর’-এর আদলে তৈরি একটি নির্যাতনকেন্দ্র। সেখানে ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন বন্দিত্বের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেলগুলোর দেয়ালে বন্দিদের লেখা চিঠি ও দিন গোনার চিহ্নও রাখা হয়েছে। পাশের সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রতীকী উপস্থাপন করা হয়েছে।জাদুঘরের মূল ভবনের একটি অংশে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৫ আগস্টের নানা স্মৃতিচিহ্ন। ওই দিন শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর গণভবনে জনতার প্রবেশ ও ভাঙচুরের বিভিন্ন নিদর্শন কাচের বাক্সে রাখা হয়েছে। বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে সেই দিনের বিভিন্ন ঘটনা ও সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাসের দৃশ্য।আরেকটি কক্ষে রয়েছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন স্মৃতি। এপিসি, নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পোশাক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি এবং ওই সময়ের বিভিন্ন আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ।জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার চিত্রও রয়েছে আলাদা অংশে। পুলিশের গাড়ি থেকে স্বজনকে উদ্ধারের চেষ্টা, হামলার মুখেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া, বৃষ্টিতে ভিজে স্লোগান দেওয়া এবং মিছিলের সামনের সারিতে নারীদের অবস্থানের নানা ছবি সেখানে স্থান পেয়েছে। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা—‘দেশটা কারো বাপের না।’জাদুঘরের আরেকটি অংশে রয়েছে জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিসামগ্রী। ঘড়ি, জুতা, টাই, শার্ট, খেলনা, জায়নামাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও পরিচয়পত্রসহ নানা নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে। রয়েছে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে সড়কের ব্যারিকেডের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচিত্রও।সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে এক শহীদের রক্তমাখা শার্ট এবং আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাবা-মায়ের উদ্দেশে লেখা শেষ চিঠি। ব্যক্তিগত এসব স্মৃতিচিহ্ন জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহকে আরও মানবিক ও হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে।গণভবন থেকে জুলাই জাদুঘর—একটি ভবনের পরিচয় বদলের সঙ্গে বদলে গেছে এর তাৎপর্যও। ছবি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, ভাস্কর্য ও স্মৃতিসামগ্রীর মাধ্যমে এখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও নিহতদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে এই জাদুঘর।
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন
অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন
একসময় দেশের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল গণভবন। এখন সেই ভবনই হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের স্মৃতিবাহী স্থান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনসহ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় তুলে ধরে গণভবনকে রূপ দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই জাদুঘর’-এ। ভবনের দেয়াল, কক্ষ ও প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত নানা নিদর্শনে উঠে এসেছে আন্দোলন-সংগ্রাম, সহিংসতা ও মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতি।
জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি ও স্লোগান। ‘বিকল্প কে, তুমি আমি আমরা’, ‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা’ এবং ‘লং মার্চ টু ঢাকা’—আন্দোলনের দিনগুলোর বহুল উচ্চারিত স্লোগানগুলো সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আরও ভেতরে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের ছবি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্র। মুক্তিযুদ্ধ, ছয় দফা, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, বাকশাল, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
জাদুঘরের মাঠের একটি অংশজুড়ে রয়েছে প্রতীকী গণকবর। সেখানে লেখা—‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান’। পাশে রয়েছে নিহত ও শহীদদের নামসংবলিত ফলক। এসব প্রতীকী উপস্থাপনা দর্শনার্থীদের সামনে দেশের বিভিন্ন সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতি তুলে ধরে।
এর পাশেই রয়েছে কাঁধে কফিন বহনকারী কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার ভাস্কর্য। এর মাধ্যমে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে। পাশের আরেকটি নামফলকে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের নাম। সেখানে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাবলির স্মৃতিও স্থান পেয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে রিকশাচালক সুজনের ভাস্কর্য। রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের অভিবাদন জানাচ্ছেন। রয়েছে জুলাইয়ে নিহত ভাইকে কাঁধে নিয়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়া দুই বোনের স্মৃতিচিত্রও।
জাদুঘরের অন্যতম আলোচিত অংশ ‘আয়নাঘর’-এর আদলে তৈরি একটি নির্যাতনকেন্দ্র। সেখানে ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন বন্দিত্বের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেলগুলোর দেয়ালে বন্দিদের লেখা চিঠি ও দিন গোনার চিহ্নও রাখা হয়েছে। পাশের সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রতীকী উপস্থাপন করা হয়েছে।
জাদুঘরের মূল ভবনের একটি অংশে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৫ আগস্টের নানা স্মৃতিচিহ্ন। ওই দিন শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর গণভবনে জনতার প্রবেশ ও ভাঙচুরের বিভিন্ন নিদর্শন কাচের বাক্সে রাখা হয়েছে। বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে সেই দিনের বিভিন্ন ঘটনা ও সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাসের দৃশ্য।
আরেকটি কক্ষে রয়েছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন স্মৃতি। এপিসি, নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পোশাক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি এবং ওই সময়ের বিভিন্ন আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ।
জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার চিত্রও রয়েছে আলাদা অংশে। পুলিশের গাড়ি থেকে স্বজনকে উদ্ধারের চেষ্টা, হামলার মুখেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া, বৃষ্টিতে ভিজে স্লোগান দেওয়া এবং মিছিলের সামনের সারিতে নারীদের অবস্থানের নানা ছবি সেখানে স্থান পেয়েছে। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা—‘দেশটা কারো বাপের না।’
জাদুঘরের আরেকটি অংশে রয়েছে জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিসামগ্রী। ঘড়ি, জুতা, টাই, শার্ট, খেলনা, জায়নামাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও পরিচয়পত্রসহ নানা নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে। রয়েছে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে সড়কের ব্যারিকেডের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচিত্রও।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে এক শহীদের রক্তমাখা শার্ট এবং আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাবা-মায়ের উদ্দেশে লেখা শেষ চিঠি। ব্যক্তিগত এসব স্মৃতিচিহ্ন জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহকে আরও মানবিক ও হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে।
গণভবন থেকে জুলাই জাদুঘর—একটি ভবনের পরিচয় বদলের সঙ্গে বদলে গেছে এর তাৎপর্যও। ছবি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, ভাস্কর্য ও স্মৃতিসামগ্রীর মাধ্যমে এখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও নিহতদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে এই জাদুঘর।