সময়টা ১৯৮৩ সাল। স্টারবাকস তখন কেবল কফির বীজ বিক্রির একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠান। আর হাওয়ার্ড শুল্টজ ছিলেন সেই কোম্পানির মার্কেটিং ডিরেক্টর। ব্যবসার কাজে সে বছর ইতালির মিলানে যান শুল্টজ। সেখানে একটি ছোট কফি শপে ঢুকে রীতিমতো অবাক হন তিনি। দোকানে কোনো টেবিল বা মেন্যু ছিল না, কিন্তু কফি প্রস্তুতকারক প্রতিটি ক্রেতার নাম জানতেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কফি পরিবেশন করছিলেন তিনি, যা দেখতে কোনো পারফরম্যান্সের চেয়ে কম ছিল না। মানুষ সেখানে শুধু কফি পান করতেই আসছিল না, বরং আড্ডা আর সুন্দর একটি সময় পার করছিল।
মিলানের সেই অভিজ্ঞতা শুল্টজের ভাবনার জগৎ বদলে দেয়। তিনি ভাবলেন, এমন কফি শপ যুক্তরাষ্ট্রে কেন থাকবে না? দেশে ফিরে স্টারবাকসের মালিকদের কাছে একটি প্রস্তাব দিলেন শুল্টজ। বললেন, ‘আমাদের শুধু কফির বীজ বিক্রি করা বন্ধ করতে হবে। কফি পানের যে অনুভূতি ও আনন্দ, তা মানুষের কাছে বিক্রি করতে হবে।’ কিন্তু তৎকালীন মালিকেরা তাঁর এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। শুল্টজ হাল ছাড়েননি। নানা হিসাব-নিকাশ ও ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আবারও বসের কাছে যান। কিন্তু এবারও মেলেনি অনুমতি। কারণ, মালিকদের লক্ষ্য ছিল শুধু কফির বীজ বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা।
নিজের স্বপ্নের ওপর প্রবল বিশ্বাস ছিল শুল্টজের। ফলে তিনি স্টারবাকসের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। পরিচিতদের কাছ থেকে ৪ লাখ ডলার জোগাড় করে সিয়াটলে ‘ইল জোর্নালি’ নামে নিজের একটি কফি শপ চালু করেন। অনেকেই তখন তাঁর এই সিদ্ধান্তকে বোকামি বলে উপহাস করেছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে দারুণভাবে পথ চলতে শুরু করে শুল্টজের দোকান। মাত্র দুই বছরের মধ্যে এর তিনটি শাখা খোলে এবং প্রতিদিন কফি নিতে ক্রেতাদের লম্বা লাইন পড়তে শুরু করে।
এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—১৯৮৭ সাল। স্টারবাকসের তৎকালীন মালিকেরা হঠাৎ করেই পুরো ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য তাঁরা দাম হাঁকেন ৩৮ লাখ ডলার। শুল্টজ এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এই বিপুল অর্থ জোগাড় করেন তিনি। এরপর, যে কোম্পানি একসময় তাঁর আইডিয়াকে দুবার ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই স্টারবাকসকেই কিনে নেন হাওয়ার্ড শুল্টজ।
মালিকানা পাওয়ার পরপরই শুল্টজ তাঁর ‘ইল জোর্নালি’র শাখাগুলোকে স্টারবাকসের সঙ্গে একীভূত করেন এবং ব্যবসার ধরন পুরোপুরি বদলে দেন। দোকানে বাজতে শুরু করে মৃদু সুরের গান, বসে আরামদায়ক চেয়ার, আর কফির কাপে হাতে লিখে রাখা হতে থাকে ক্রেতার নাম। ফলে স্টারবাকস কেবল কফি পানের দোকান রইল না; এটি হয়ে উঠল মানুষের বাড়ি আর অফিসের মাঝখানের এক টুকরো আরামদায়ক আশ্রয়।
পরবর্তী ১০ বছরে স্টারবাকসের শাখা দাঁড়ায় ১ হাজারে। আর বর্তমানে বিশ্বের ৮৪টি দেশে ৩৬ হাজারেরও বেশি শাখা নিয়ে রাজত্ব করছে এই ব্র্যান্ড। স্টারবাকসের এই সাফল্যের মূল রহস্য ছিল—আগের মালিকেরা শুধু কফি বুঝতেন, আর শুল্টজ বুঝেছিলেন মানুষের মন। ব্যবসায় যে ব্যক্তি মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝেন, দিনশেষে জয়ী যে তিনিই হন, শুল্টজ তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।