এক ফোঁটা মদও ছুঁয়ে দেখেননি, অথচ আচরণ অবিকল মাতালের মতো। শুনতে অবাস্তব মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন এক বিরল রোগের অস্তিত্ব রয়েছে। রোগটির নাম ‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম’। এতে মানুষের অন্ত্রেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালকোহল তৈরি হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো মাদক না নিয়েও নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা বলছেন, শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়ার পর এই রোগীদের রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায়, যা গুরুতর মাতাল অবস্থার সমান।
কতটা বিরল এই রোগ?
অটো-ব্রুয়ারি অত্যন্ত বিরল একটি রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খুব কম মানুষের শরীরে এটি শনাক্ত হয়েছে। শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক—যে কারও এই রোগ হতে পারে।
১৯৪৮ সালে আফ্রিকায় প্রথম এক ৫ বছরের শিশুর শরীরে রোগটি ধরা পড়ে। এটি এতটাই বিরল যে, বিশ্বের বহু দেশে এখন পর্যন্ত এর কোনো রোগীই পাওয়া যায়নি।
কেন বাড়ে আইনি জটিলতা?
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই চরম সামাজিক ও আইনি সংকটে পড়েন। যেহেতু তারা মদ্যপানের কথা অস্বীকার করেন, তাই পরিবার, কর্মস্থল বা পুলিশ—কেউই প্রথমে তাদের কথা বিশ্বাস করতে চায় না।
যেমন, ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনায় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বারবার দাবি করছিলেন, তিনি মদ খাননি। পরিবার বা চিকিৎসক—কেউই তখন তার কথা বিশ্বাস করেনি। অবশেষে ২০১৫ সালে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, ওই ব্যক্তি আসলে ‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম’-এ ভুগছেন।
রোগের লক্ষণগুলো কী?
আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মদ্যপানের সব উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন:
শরীরের ভারসাম্য হারানো ও মাতালের মতো আচরণ
মাথা ঘোরা ও জড়িয়ে কথা বলা
আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন
গাড়ি চালানো বা স্বাভাবিক কাজ করতে সমস্যা হওয়া
রক্তে অ্যালকোহলের উপস্থিতি ধরা পড়া
রোগ নির্ণয় ও ঝুঁকি
ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং ক্রোনস রোগে (অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ) আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এটি নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা কিছু পরীক্ষা করেন:
রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা।
এন্ডোস্কপি।
রোগীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ (প্রায় ২০০ গ্রাম) গ্লুকোজ খাইয়ে নির্দিষ্ট সময় পর পর রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা মাপা।
চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
এই রোগের মূল চিকিৎসা হলো অন্ত্রের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও ইস্টের (ছত্রাক) ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। চিকিৎসকেরা সাধারণত নিচের পরামর্শগুলো দিয়ে থাকেন:
শর্করা ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেওয়া।
অন্ত্রের ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করা।
দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে এই সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তা বন্ধ বা পরিবর্তন করা।
১৯৭০-এর দশক থেকে এই রোগ নিয়ে আলোচনা হলেও এটি নিরাময়ের সুনির্দিষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক গাইডলাইন এখনো তৈরি হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও ওষুধের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।