হরমুজ প্রণালিতে গতকাল দুটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে এক ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। সঙ্গে আরো আটজন আহত হওয়ার অভিযোগ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন অবরোধের অংশ হিসেবে জলপথটি ব্যবহার করা সব পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। খবর বিবিসি।
গতকাল রাতে ইউএই জানায়, ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি জাতীয় ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরো আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় এবং দুজন ইউক্রেনীয় নাগরিক বলে এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইউএই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
টেলিগ্রামে দেয়া এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, দুটি ট্যাংকার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল, নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ এবং মাইন পাতা একটি রুট দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্যাংকার দুটিতে আঘাত হেনে অচল করে দেয়া হয়।
তারা আরো বলে, ‘আগ্রাসী শত্রুকে’ সহযোগিতা করলে শেষ পর্যন্ত অনুশোচনা, ক্ষতি এবং প্রণালি খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হবে, পাশাপাশি ‘বিশ্বে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি’ হবে।
এদিকে টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে হামলা চানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তারা ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এ বিরোধ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দিতে পারে। তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, এখনো একটি চুক্তি সম্ভব।
এদিকে অবরোধের ঘোষণার জবাবে ট্রাম্পের ব্যবহৃত একই শব্দ ব্যবহার করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান প্রণালিটির ‘গার্ডিয়ান’ বা অভিভাবক হিসেবে থাকবে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করবে।
তিনি বলেন, এর ফলে ‘ইরানের জাহাজ বা তাদের গ্রাহকরা’ গুরুত্বপূর্ণ এ জ্বালানি তেল পরিবহনপথে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারবে না। তবে ‘অন্যান্য সব দেশ প্রণালিটি ন্যায্য ও উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারবে।’
মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা থেকে অবরোধ কার্যকর হবে বলেও তিনি জানান।
ট্রাম্প লেখেন, এই মুহূর্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘দ্য গার্ডিয়ান অব দ্য হরমুজ স্ট্রেইট’ বা ‘হরমুজ প্রণালির অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত হবে। ‘তবে ন্যায্যতার খাতিরে, বিশ্বের এ অত্যন্ত অস্থিতিশীল অংশে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদানের কাজটি সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খরচ মেটাতে’ এই পথ দিয়ে আসা সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে চার্জ পরিশোধ করতে হবে।
সোমবার রাতে ইরানে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ইরানজুড়ে বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল বুশেহর, চাহ বাহার, জাস্ক, কোনারাক, আবু মুসা এবং বান্দার আব্বাস। সেন্টকমের ভাষ্যে, এর লক্ষ্য ছিল ‘বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা আরো কমিয়ে দেয়া’।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক সম্পদকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকম জানায়, তাদের বাহিনী ১৪ জুলাই থেকে ‘ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া সামুদ্রিক যান চলাচলের ওপর অবরোধ পুনরায় আরোপ করবে’।
সেন্টকমের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অবরোধ লঙ্ঘন করছে না এমন সব জাহাজের জন্য আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচল অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে বৈশ্বিক নৌপরিবহন নিয়ন্ত্রক জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) এক মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, ‘আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য ফি আরোপের বিরোধী অবস্থানে দৃঢ় রয়েছে আইএমও।’
মুখপাত্র আরো বলেন, ‘শুধু কোনো প্রণালি অতিক্রম করার জন্য বাধ্যতামূলক টোল আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
জাতিসংঘের বিধিমালা অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (১৩ দশমিক ৮ মাইল) পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারে। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে হরমুজ প্রণালি এবং এর নৌপথ সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত।