বুধবার|বাংলা: ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ|ইংরেজি: ১৫ জুলাই ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ|আরবি: ২৯ মহররম ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

মিরপুরে জলাবদ্ধতা: ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে বিপাকে হাজারো পরিবার

মিরপুরে জলাবদ্ধতা: ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে বিপাকে হাজারো পরিবার
ছবি: সংগৃহীত
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
টানা কয়েক ঘণ্টার মুষলধারে বৃষ্টিতে রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর কার্যত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, দোকানপাট, এমনকি বহু বাসাবাড়ির নিচতলাও বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা নিচু এলাকার একতলা কিংবা আধাপাকা ঘরে বসবাস করেন। ঘরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রক্ষা করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খাট, টেবিল কিংবা ইটের ওপর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তুলে রেখেছে। কোথাও কোথাও শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

রবিবার (১২ জুলাই) সকাল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে মিরপুর রোডসংলগ্ন শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, সেনপাড়া, মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, পল্লবী এবং আশপাশের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বেগম রোকেয়া সরণির বিভিন্ন অংশে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়। ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন আয়ের বাসিন্দারা। যেসব পরিবার নিচতলায় ভাড়া থাকেন, তাদের অনেকের ঘরে সকাল থেকেই পানি ঢুকতে শুরু করে। বৃষ্টির পানি ড্রেন উপচে নোংরা পানির সঙ্গে মিশে ঘরে প্রবেশ করায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। অনেকেই ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেন দুর্ঘটনার আশঙ্কায়। কেউ কেউ শিশুদের কোলে নিয়ে প্রতিবেশীর বাসায় আশ্রয় নেন। রান্নাঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় অনেক পরিবার দুপুর পর্যন্ত রান্নাও করতে পারেনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি সড়কে উঠে আসে, পরে তা আশপাশের বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে। নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের ধীরগতির কারণেই পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।

জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পথচারীরা। অনেককে জুতা হাতে নিয়ে, প্যান্ট গুটিয়ে নোংরা পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও রাস্তার গর্ত ও খোলা ম্যানহোল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাননি।

গণপরিবহন সংকটও দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পানি জমে থাকায় অনেক বাস নির্ধারিত রুটে চলাচল করতে পারেনি। যেসব বাস চলেছে, সেগুলোও ধীরগতিতে চলায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। রিকশা ও সিএনজি চালকদের অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করেছেন। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন।

ওপরে মেট্রোরেল স্বাভাবিকভাবে চলাচল করলেও নিচে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে নামতেই যাত্রীদের হাঁটুসমান পানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের চারপাশে পানি জমে থাকায় অনেক যাত্রী দীর্ঘ সময় স্টেশনের ভেতরে অপেক্ষা করেছেন। কেউ কেউ বৃষ্টি কমার আশায় ফুটওভার ব্রিজে অবস্থান নেন। আধুনিক নগর পরিবহনের সুবিধা ব্যবহার করেও শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধতার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।

সড়কে জমে থাকা পানির কারণে অসংখ্য রিকশা, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। মোটরসাইকেল চালকেরা ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছেন। কোথাও কোথাও রিকশা উল্টে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে। পানি ঢেকে দেওয়ায় সড়কের গর্ত বোঝা না যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এর ফলে মিরপুর-১০ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব আশপাশের বিভিন্ন সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে।

শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়ার ভেতরের শাখা সড়কগুলোর অবস্থা ছিল আরও করুণ। নিচু এলাকার অনেক দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। মুদি দোকান, ফার্মেসি, চায়ের দোকানসহ ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক দোকানদার বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন।

মিরপুরের বাসিন্দারা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচল নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। ড্রেনের ময়লা পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় শিশু ও বয়স্কদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মশার প্রজনন বাড়ার মাধ্যমে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।

শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জাহিদুল ইসলাম (৪২) জানান, সকাল থেকেই ঘরের ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বিছানা, আলমারি, ফ্রিজের নিচ পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। অনেক কষ্ট করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় তুলেছি। প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না। আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ, ঘর ভাসলে থাকার আর কোনো জায়গা থাকে না।

কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা  রাবেয়া বেগম (৫০) বলেন, রান্নাঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় সকালে রান্না করতে পারিনি। ড্রেনের নোংরা পানি ঘরে ঢুকে পুরো পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। ছোট নাতি-নাতনিদের নিয়ে খুব ভয় লাগছে। এভাবে যদি সারারাত বৃষ্টি হয়, তাহলে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

সেনপাড়া এলকার বাসিন্দা শাহিনা আক্তার (৩৮) বলেন, আমাদের বাসার নিচতলায় কোমরসমান পানি। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারিনি। বিদ্যুতের সুইচবোর্ডের কাছাকাছি পানি চলে আসায় সংযোগ বন্ধ করে রেখেছি। সব সময় দুর্ঘটনার ভয় কাজ করছে। অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়ে দেখি পুরো রাস্তা পানির নিচে। কোথায় গর্ত, কোথায় ম্যানহোল কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। জুতা হাতে নিয়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। রাজধানীর মতো শহরে এমন পরিস্থিতি সত্যিই হতাশাজনক। 

মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম (৪৮) বলেন, মেট্রোরেল চালু হয়েছে, বড় বড় উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু স্টেশন থেকে নিচে নামলেই হাঁটুপানি। উন্নয়ন যদি মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমাতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ সেই উন্নয়নের সুফল কোথায় পাবে? ঘরে পানি ঢুকে চাল-ডাল, কাপড়চোপড় সব ভিজে গেছে। ছোট একটা ঘরে থাকি, পানি উঠলে থাকার কোনো জায়গা থাকে না। প্রতিবছর এমন ক্ষতি হয়, কিন্তু কেউ খোঁজও নেয় না।

এদিকে, জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে শনিবারও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। বৃষ্টির মধ্যেই তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পাম্প চালু করা বা ড্রেন পরিষ্কার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী দিনগুলোতেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

বহুতল ভবন, উড়ালসড়ক এবং মেট্রোরেলের মতো আধুনিক অবকাঠামোর সমহারের মিরপুরে বর্ষার দিনে এখনও মানুষের প্রধান লড়াই জমে থাকা বৃষ্টির পানির সঙ্গে। প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাই সাময়িক উদ্যোগ নয়, স্থায়ী সমাধান নিশ্চিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, খাল ও নালা পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না হলে প্রতি বর্ষায় একইভাবে পানির নিচে ডুবে থাকবে মিরপুর; আর সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে নিম্ন আয়ের হাজারো পরিবারকে।
নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান শাকিরার

শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান শাকিরার

প্রতিবেদক: বিনোদন ডেস্ক
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে কার্যবণ্টন বিধিমালা সংশোধনের নির্দেশ

সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে কার্যবণ্টন বিধিমালা সংশোধনের নির্দেশ

প্রতিবেদক: প্রোব ডেস্ক
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তরার সড়কে অবস্থান শিক্ষার্থীদের

দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তরার সড়কে অবস্থান শিক্ষার্থীদের

প্রতিবেদক: প্রোব ডেস্ক
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
মার্কিন হামলায়  ইরানে নিহত ৩০

মার্কিন হামলায় ইরানে নিহত ৩০

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬