বুধবার|বাংলা: ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ|ইংরেজি: ১৫ জুলাই ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ|আরবি: ২৯ মহররম ১৪৪৮ হিজরি
ঢাকা, বাংলাদেশ
--° সে.
মেনু

সহকারী কমিশনারদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ও বাস্তবতা

সহকারী কমিশনারদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ও বাস্তবতা
এই সংবাদের সংবাদপত্র সংস্করণ (PDF) ডাউনলোড করুন

অফলাইন পড়ার জন্য প্রিন্ট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহে রাখুন

ডাউনলোড করুন
সম্প্রতি সহকারী কমিশনারদের ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’ পরিচয় দেওয়া নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজেদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দিয়ে আইনি ক্ষমতার অপব্যাখ্যা করছেন। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সমালোচনা আংশিক এবং বিভ্রান্তিকর।

বিষয়টি নিয়ে মো. আনিসুর রহমান সুমন নামে এক ব্যক্তি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ওই প্রতিবেদনে বিষয়টি ঘুরিয়ে পেচিয়ে ভুলভাবে উপস্থাপন করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদটিকে বিতর্কিত করা হয়েছে।

আনিসুর রহমান সুমনের ফেসবুক পোস্টটি ঢাকাপ্রোবের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘প্রথম আলো পত্রিকায় ০৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে শামস নজিব নামে প্রথম আলোর এক আইন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন "সহকারী কমিশনার’ হয়ে ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’ পরিচয় দেওয়া কতটা যৌক্তিক"? ৪৭তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশের পর এক আইনজীবী ফেসবুক পোস্ট এই বিষয়টিকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে আইনের আংশিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে যে রেফারেন্স দেখানো হয়েছে তা অর্ধেক এবং তাতে প্রশাসন ক্যাডারের প্রতি চূড়ান্ত বিদ্বেষ দেখানো হয়েছে, পরোক্ষভাবে অর্ধ সত্য উপস্থাপন করে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্গানের প্রতি বীতশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়৷

ম্যাজিস্ট্রেট শব্দটি কোথা থেকে আসলো এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর ব্যবহারের পরিধি কোন পর্যায়ে বিস্তৃত সেটি বিশ্লেষণ করা যাক। লেখাটি স্বাভাবিকভাবেই বড় হবে এবং পাঠকদের একটু ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ব্রিটিশ উপনিবেশিক ব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করে। সে সময় “ম্যাজিস্ট্রেট” ছিল একটি একক পদ, যেখানে প্রশাসনিক ও বিচারিক—উভয় ক্ষমতাই একই কর্মকর্তার হাতে ন্যস্ত ছিল।
২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মাধ্যমে (Separation of Judiciary) এই একক কাঠামো ভেঙে যায়। তখন থেকেই “ম্যাজিস্ট্রেট” দুই ভাগে বিভক্ত হয়—Judicial Magistrate ও Executive Magistrate। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর  6(2) ধারা অনুযায়ী—“There shall be two classes of Magistrate, namely: -(a) Judicial Magistrate; and (b) Executive Magistrate”
এখানে স্পষ্টভাবে দুই শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা হয়েছে।

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নয় এর সপক্ষে ফৌজদারি কার্যবিধি,১৮৯৮ এর সংশ্লিষ্ট ধারা, উপধারাগুলো কোট করার সময় বিজ্ঞ আইনজীবী ও জনৈক আইন কর্মকর্তা কিছুটা চালাকির আশ্রয় নিয়েছেন। কী চালাকি করেছেন তা দেখা যাক।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ১০(১), ১০(৪) ও ১০(৫)  মিলিয়ে পড়লেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
বুঝার সুবিধার্তে আইনের অরিজিনাল টেক্সট ব্যবহার করা হলো-
10.(1) In every district and in every Metropolitan Area, the Government shall appoint as many persons as it thinks fit to be Executive Magistrates and shall appoint one of them to be the District Magistrate
সিআরপিসির এই উপধারাটি সেল্ফ এক্সপ্লেনেটরি। অর্থাৎ এখানে সরকার যেকোন জেলায় ও মেট্রোপলিটন এলাকায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এবং তন্মধ্যে একজনকে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিবে সে বিষয়টিই বলা আছে।
10(5) - The Government may, if it thinks expedient or necessary, appoint any persons employed in the Bangladesh Civil Service (Administration) to be an Executive Magistrate and confer the powers of an Executive Magistrate on any such member.
এই উপধারাটি “enabling provision”—অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়। অনেকে মনে করে থাকেন সরকার প্রশাসন ক্যাডার থেকে জেলায় যে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে থাকেন তার সোর্স এই উপধারাটি। বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল৷ এখানে বলা হয়েছে।
"The Government may, if it thinks expedient or necessary" অর্থাৎ সরকার যদি জরুরি ও প্রয়োজনীয় মনে করে, তার মানে হলো সরকার জরুরি ও প্রয়োজনীয় মনে না করলে প্রশাসন ক্যাডার থেকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিবে না। এখানেই উকিল সাহেব ও জনৈক আইন কর্মকর্তা চালাকিটা করেছে।

সরকার এই উপধারা অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে থাকেন বিশেষ পরিস্থিতিতে। যেমন- ধরুন নির্বাচনের সময় দেশব্যাপী কয়েকশো অতিরিক্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন হয়৷ সরকার তখন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র সহকারী সচিব ও উপসচিবদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ক্ষমতা অর্পণ করে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব দিয়ে পাঠায়।
10(6) Subject to the definition of the local areas under sub-section (4) all persons appointed as Assistant Commissioners, Additional Deputy Commissioners or Upazila Nirbahi Officer in any District or Upazila shall be Executive Magistrates and may exercise the power of Executive Magistrate within their existing respective local areas.
সহকারী কমিশনার, সহকারী কমিশনার( ভূমি), ইউএনও এবং এডিসি Shall be Executive Magistrate. এই উপধারার ক্ষমতা অনুযায়ীই প্রত্যেক সহকারী কমিশনার বাই ডিফল্ট এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেসি প্রত্যেক সহকারী কমিশনারের Inherent Power। সরকারকে আলাদা করে ক্ষমতা দেওয়ার দরকারই নেই।

এই উপধারা অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা তাদের লেখার কোথাও নেই। এটাই অতিরিক্ত চতুরতা! এখানে "Shall be" ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে “shall be” একটি বাধ্যতামূলক (mandatory) নির্দেশনা। আইন ব্যাখ্যার স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী—
“Shall” ordinarily denotes a mandatory obligation unless context suggests otherwise.
অর্থাৎ, সহকারী কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ পদাধিকারবলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট—এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়।
যদিও সরকার আলাদা করে পদায়নের প্রজ্ঞাপনে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ক্ষমতা অর্পণ করে যেটি নিষ্প্রয়োজন।
এই বিতর্ক বোঝার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি প্রযোজ্য— Literal Rule (শব্দগত ব্যাখ্যা) আইনের ভাষা স্পষ্ট হলে সেটিকে সরাসরি অর্থে গ্রহণ করতে হয় এবং Expressio Unius Est Exclusio Alterius অর্থাৎ যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তার বাইরে অন্য কিছু ধরে নেওয়া যাবে না। আইন সরাসরি AC, ADC, UNO-কে Executive Magistrate বলেছে।
যেভাবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন, একইভাবে জুডিশিয়াল সার্ভিস এর কর্মকর্তা তথা সিভিল জজদের ধারা- ১১ অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, সরকার চাইলে ১১(৪) উপধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে যেকোন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।
উপধারা - ১৯০(৪) অনুযায়ী সরকার চাইলে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের কগনিজেন্স তথা মামলা আমলে নেওয়ার ক্ষমতাও অর্পণ করতে পারে।

সিভিল জজদের আলাদা করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর ক্ষমতা অর্পণ করা লাগলেও সহকারী কমিশনারগণ যেদিন জেলায় যোগদান করবেন সেদিন থেকেই এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।
সিভিল জজদের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদ এর ব্যবহার নিয়ে উকিল ও কলাম লেখকদের আপত্তি না থাকলেও প্রশাসন ক্যাডারদের প্রতি কেন যেন অতিরিক্ত গাত্রদাহ! অথচ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট উভয়ই একই প্রক্রিয়ায় আইনসিদ্ধ। তাদের কাজের নেচার শুধু আলাদা। ব্রিটিশ এডমিনিস্ট্রেটিভ সিস্টেমের লিগ্যাসি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও পাকিস্তান বহন করে চলেছে। বাংলাদেশে সেপারেশন অফ পাওয়ার ২০০৭ সালে হলেও ভারতে হয়েছে গত শতকের ৫০ এর দশকে ও পাকিস্তানে ৯০ এর দশকে।
ভারতের Crpc, 1973 এর ২০ ধারা এবং বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি,১৮৯৮ এর ১০ ধারা অবিকল একই। এই ধারা অনুযায়ী, সরকার IAS ক্যাডারদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এমনকী, স্পেশাল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর প্রভিশনও সেম।

ভারতের CrPc,1973 এর 20,22,23 ধারাগুলো এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সংক্রান্ত৷ অর্থাৎ ভারতেও এডমিন ক্যাডারের অফিসারগণ নিজেদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে থাকেন।
সেখানে সেপারেশন অফ পাওয়ার নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। তাদের জেলা প্রশাসককে যথাক্রমে বাংলায় (জেলা শাসক) ও ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বলা হয়। সেখানে সুশীলদের অযাচিত আস্ফালন নেই! যতটা বাংলাদেশে আছে সুশীল নামধারীদের অযাচিত আস্ফালন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৬(২), ১০, ১২(১), ১৭, ৪২,৬৪, ৬৫, ৯৮,১০০,১০৩,১০৭,১০৬,১০৭,১০৮,১০৯,১১০,১১১,১১১,১১২,১১৩,১১৪,১১৫,১১৬,১১৭,১১৮,১১৯,১২০,১২১,১২২,১২৩,১২৪,১২৫,১২৬,১২৭,১২৯,১৩০,১৩২,১৩৩,১৪৪,১৪৫,১৪৬,১৪৭,১৪৮,১৭৪, ১৯০(৪), ১৯৬ (বি) সহ আরো অসংখ্য ধারা সরাসরি এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সংক্রান্ত। এছাড়া আরো অসংখ্য আইনে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে বলা রয়েছে। অথচ, জনৈক কলাম লেখকের কথায় যেন মনে হচ্ছে- এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নামে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনাররা জোর করে  এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হতে চাচ্ছেন!!!
সিভিলভিল জজ থেকে নিয়োজিত হয়ে বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ যেভাবে নিজেদের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিতে পারেন, সহকারী কমিশনার গণও একইভাবে নিজেদের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিতে পারেন।’

নিউজটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান শাকিরার

শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান শাকিরার

প্রতিবেদক: বিনোদন ডেস্ক
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে কার্যবণ্টন বিধিমালা সংশোধনের নির্দেশ

সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে কার্যবণ্টন বিধিমালা সংশোধনের নির্দেশ

প্রতিবেদক: প্রোব ডেস্ক
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তরার সড়কে অবস্থান শিক্ষার্থীদের

দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তরার সড়কে অবস্থান শিক্ষার্থীদের

প্রতিবেদক: প্রোব ডেস্ক
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
মার্কিন হামলায়  ইরানে নিহত ৩০

মার্কিন হামলায় ইরানে নিহত ৩০

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬