প্রাণের ক্যাম্পাসের স্মৃতি আর তারুণ্যের সেই অমলিন দিনগুলোর ফিরে পাওয়ার আনন্দে এক ফ্রেমে ধরা থাকল বন্ধুত্ব। ছবি: নুর আমিন
সময়ের দূরত্ব কখনো কখনো কয়েক দশকের হয়, কিন্তু স্মৃতির দূরত্ব হয় না। তাই দীর্ঘদিন পর সরকারি বাঙলা কলেজের ফটক পেরিয়ে প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে অনেকেরই মনে হলো, যেন সময় থমকে আছে। চেনা গাছ, পরিচিত ভবন আর প্রিয় মুখগুলোর সঙ্গে পুনর্মিলনে একে একে ফিরে এলো তারুণ্যের অগণিত স্মৃতি। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার ৬৪ বছর পর প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাবেক শিক্ষার্থীদের এই মিলনমেলা হয়ে উঠল শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক আবেগময় উপলক্ষ। দীর্ঘ ছয় দশকের ইতিহাসে এমন আয়োজন ছিল অনেকেরই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল।
সকালের আলো গড়াতেই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও কলেজ প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে বিভিন্ন ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ আবার বহু বছর পর খুঁজে পেয়েছেন হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীকে। করমর্দন, আলিঙ্গন, হাসি আর স্মৃতিচারণে যেন সময়ের ব্যবধান মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়।
সরকারি বাঙলা কলেজের ইতিহাসও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা ভাষার মর্যাদা ও ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেই প্রতিষ্ঠার সময় কলেজটির নাম রাখা হয়েছিল ‘বাঙলা কলেজ’। নামের মধ্যেই যে ভাষাপ্রেমের ইতিহাস জড়িয়ে আছে, পুনর্মিলনীর দিন সেটিও উঠে আসে বিভিন্ন বক্তার কথায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) এমপি ও সানজিদা ইসলাম তুলি এমপি। অনুষ্ঠানে সরকারি বাঙলা কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার ভবন বা অবকাঠামো নয়; বরং তার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং তাঁদের গড়ে তোলা ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে আরও দৃঢ় করতেই এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।
দিনজুড়ে ছিল স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ছবি তোলা আর প্রিয় শিক্ষকদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। পুরোনো শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি কিংবা ক্যাম্পাসের পরিচিত গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই ফিরে গেছেন ছাত্রজীবনের দিনগুলোয়। কেউ বলছিলেন প্রথম ক্লাসের কথা, কেউ মনে করছিলেন পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো বিকেলগুলোর কথা।
বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্যও দিনটি ছিল ভিন্ন অভিজ্ঞতার। বিভিন্ন প্রজন্মের প্রাক্তনদের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তাঁরা জানতে পেরেছেন কলেজের দীর্ঘ পথচলার গল্প, সাফল্য আর সংগ্রামের নানা অধ্যায়।
অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে বিদায়ের মুহূর্তে আবেগ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেকেই পরস্পরের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার অঙ্গীকার করেন। কারও কণ্ঠে শোনা যায়, ‘এত বছর পর ফিরে এসে মনে হলো, কলেজটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করেই ছিল।’
ছয় দশকের ইতিহাসে প্রথম এই পুনর্মিলনী তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ, শিকড়কে নতুন করে স্পর্শ করার মুহূর্ত এবং আগামী প্রজন্মের হাতে একটি ঐতিহ্য তুলে দেওয়ার প্রতীক।